বৃদ্ধ মা বাবার যত্ন নেওয়ার নিয়ম, ইসলামে প্রবীণদের অধিকার, বার্ধক্যজনিত সেবার সুন্নাত, পারিবারিক বন্ধন ও ইসলাম, হক্কুল ইবাদ বা মানুষের অধিকার, DeeninfoBD।
বার্ধক্যের ছায়া: মুরুব্বি ও বৃদ্ধ মা-বাবার যত্ন নেওয়ার ১০টি কালজয়ী ইসলামিক গাইডলাইন
শৈশব যেমন মানুষের জীবনের প্রথম দুর্বলতম অধ্যায়, ঠিক তেমনি বার্ধক্য বা বৃদ্ধ বয়স হলো মানুষের জীবনের শেষ ও সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষ কেবল শারীরিকভাবেই দুর্বল হয় না, মানসিকভাবেও অত্যন্ত একাকী ও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমান আধুনিক কর্পোরেট যুগে ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়ে অনেকেই নিজেদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ও বৃদ্ধ মা-বাবার খবর নেওয়ার সময় পাচ্ছেন না। ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক। ইসলাম আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে প্রবীণদের যে অধিকার ও সম্মানের কথা ঘোষণা করেছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো দর্শনে পাওয়া যায় না। আজ আমরা আলোচনা করব কীভাবে কুরআন ও সুন্নাহর গাইডলাইন মেনে আমরা আমাদের মুরুব্বিদের সেবা করব এবং দুনিয়া ও আখেরাতের বরকত অর্জন করব।
১. বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা: জিহাদের চেয়েও উত্তম ইবাদত
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মা-বাবার প্রতি সুন্দর আচরণের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, "তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা ইসরা: ২৩)। এক ব্যক্তি যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন, তখন নবীজী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার মা-বাবা কি জীবিত আছেন?" সে বলল, "হ্যাঁ।" নবীজী বললেন, "তবে তুমি তাঁদের সেবার মাধ্যমে জিহাদ করো।" (সহীহ বুখারী)।
২. মুখের ভাষায় চরম নম্রতা (উফ শব্দটিও না বলা)
বার্ধক্যের কারণে অনেক সময় মুরুব্বিরা শিশুদের মতো আচরণ করেন, একই কথা বারবার বলেন কিংবা খিটখিটে মেজাজের হয়ে যান। এই সময়ে সন্তানের চরম ধৈর্যের পরীক্ষা হয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, "তাঁদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাঁদের 'উফ' (বিরক্তিপ্রকাশক শব্দ) বলো না এবং তাঁদের ধমক দিও না; বরং তাঁদের সাথে সম্মানসূচক নম্র কথা বলো।" (সূরা ইসরা: ২৩)। তাঁদের কোনো কথায় বিরক্ত না হয়ে হাসিমুখে তা মেনে নেওয়াই হলো প্রকৃত শিষ্টাচার।
৩. প্রবীণদের সম্মান করা আল্লাহকে সম্মান করার শামিল
ইসলাম কেবল নিজের মা-বাবা নয়, সমাজের প্রতিটি প্রবীণ বা বয়স্ক মানুষকে সম্মান করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "নিশ্চয়ই চুল পাকা বৃদ্ধ মুসলমানকে সম্মান করা মহান আল্লাহকে সম্মান করার অংশ।" (সুনানে আবু দাউদ)। রাস্তাঘাটে, বাসে, কিংবা কোনো মজলিসে বয়স্ক মানুষদের বসার জায়গা করে দেওয়া, তাঁদের আগে যেতে দেওয়া এবং তাঁদের সম্মানের সাথে সম্বোধন করা প্রতিটি তরুণ ও যুবকের ঈমানী দায়িত্ব।
৪. শারীরিক অসুস্থতায় সুন্নতি সেবা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা
বৃদ্ধ বয়সে শরীরে নানা রকম রোগব্যাধি বাসা বাঁধে। এই সময়ে মুরুব্বিদের নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, সময়মতো ওষুধ খাওয়ানো এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা সন্তানদের দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে অসুস্থ সাহাবিদের দেখতে যেতেন এবং তাঁদের কপালে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতেন। মুরুব্বিরা যখন অসুস্থ হন, তখন তাঁদের পাশে বসে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া বা তাঁদের হাত চেপে ধরে রাখলে তাঁরা যে মানসিক শক্তি পান, তা দামি ওষুধেও সম্ভব নয়।
৫. একাকীত্ব দূর করা এবং গুণগত সময় (Quality Time) দেওয়া
বর্তমান যুগের বৃদ্ধদের সবচেয়ে বড় রোগ হলো 'একাকীত্ব'। সন্তানরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত, নাতি-নাতনিরা ব্যস্ত মোবাইল ফোন নিয়ে; ফলে ঘরের এক কোণে প্রবীণরা চরম অবহেলায় দিন কাটান। প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা মুরুব্বিদের পাশে বসুন, তাঁদের অতীতের গল্প শুনুন, তাঁদের পরামর্শ চান। ইসলামে মুরুব্বিদের সাথে পরামর্শ বা শূরা করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এতে তাঁরা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন এবং তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
৬. তাঁদের আর্থিক স্বাধীনতা ও খরচের দায়িত্ব নেওয়া
অনেক সন্তান মনে করেন মা-বাবাকে শুধু তিন বেলা খেতে দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সেও তাঁদের কিছু নিজস্ব পছন্দ, দান-সদকাহ করার ইচ্ছা বা পকেট খরচের প্রয়োজন থাকে। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি নবীজীর কাছে এসে অভিযোগ করল যে তার বাবা তার সম্পদ নিয়ে নিচ্ছেন। নবীজী তখন বললেন, "তুমি এবং তোমার সম্পদ—সবই তোমার বাবার।" (ইবনে মাজা)। তাই মুরুব্বিদের হাতে নিয়মিত কিছু টাকা দেওয়া উচিত যেন তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন।
৭. প্রবীণদের অতীত অবদানকে স্মরণ করা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
আজ আমরা যে ক্যারিয়ার, বাড়ি বা সুন্দর জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তা কিন্তু আমাদের মুরুব্বিদের জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের ফসল। তাঁদের এই অবদানকে সবসময় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা উচিত। সন্তান বা অনুজদের মুখে নিজের ত্যাগের স্বীকৃতি শুনলে প্রবীণদের হৃদয় শান্তিতে ভরে ওঠে। তাঁদের কখনো সমাজের বা পরিবারের 'বোঝা' মনে না করে, পরিবারের 'রহমত ও বরকত' মনে করা উচিত।
৮. তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা
মা-বাবার মৃত্যুর পর বা তাঁদের জীবিতাবস্থায় তাঁদের প্রিয় বন্ধুদের এবং আত্মীয়দের সম্মান করা একটি চমৎকার সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর ইন্তেকাল করে যাওয়া স্ত্রী খাদিজা (রাঃ)-এর বান্ধবীদের বাড়িতে নিয়মিত উপহার পাঠাতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) মুরুব্বিদের বন্ধুদের অত্যন্ত সমীহ করতেন। মা-বাবার বন্ধুদের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের সম্মান করা মা-বাবার প্রতি পরোক্ষ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
৯. মুরুব্বিদের দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া
বার্ধক্য হলো আখেরাতের প্রস্তুতির সময়। এই সময়ে মুরুব্বিরা যেন সহজে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারেন, ঘরে বা মসজিদে সেই সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে দিন। তাঁদের জন্য বড় অক্ষরের কুরআন মাজিদ, দ্বীনি বইপত্র বা ইসলামিক আলোচনা শোনার ব্যবস্থা করে দেওয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, তাঁদের কোনো ইবাদতের জন্য জোরজবরদস্তি করা যাবে না, বরং ভালোবেসে ও সহযোগিতার মাধ্যমে উৎসাহিত করতে হবে।
১০. তাঁদের জন্য প্রতিনিয়ত জান্নাতি দোয়া করা
মুরুব্বিদের জন্য, বিশেষ করে নিজের মা-বাবার জন্য জীবিত এবং মৃত—উভয় অবস্থাতেই প্রতিনিয়ত দোয়া করা সন্তানের প্রধান কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই অলৌকিক দোয়াটি শিখিয়ে দিয়েছেন: "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।" (অর্থ: হে আমার রব! তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছিলেন। — সূরা ইসরা: ২৪)
উপসংহার
আজ যারা তরুণ বা যুবক, সময়ের নিয়মে তারাও একদিন প্রবীণ হবে। আজ আমরা আমাদের মুরুব্বিদের সাথে যেমন আচরণ করব, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানরাও আমাদের সাথে ঠিক তেমনই আচরণ করবে—এটি প্রকৃতির এক চিরন্তন নিয়ম। প্রবীণদের সেবা করা কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের ঈমানের দাবি এবং জান্নাতে যাওয়ার সহজতম উপায়। আসুন, আমরা আমাদের ঘরগুলোকে বৃদ্ধাশ্রম মুক্ত রাখি এবং মুরুব্বিদের হাসিমুখের দোয়ায় আমাদের জীবনকে ধন্য করি। DeeninfoBD-এর সাথে আপনার এই মানবিক ও দ্বীনি সচেতনতার যাত্রা সফল হোক।

Comments
Post a Comment