ফারুক-এ-আজম, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, উমরের শাসনব্যবস্থা, পারস্য ও রোম বিজয়, ন্যায়বিচারক উমর।
ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক হযরত উমর (রাঃ): ইসলামের স্বর্ণযুগ ও এক কালজয়ী শাসনব্যবস্থা
ইসলামের ইতিহাসে যার নাম নিলে আজও বাতিলের হৃদস্পন্দন থেমে যায়, তিনি হলেন আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)। তাঁর ১০ বছরের শাসনামল ছিল ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত সময়। তিনি কেবল একজন খলিফা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা।
১. আরবের সিংহ থেকে ইসলামের ফারুক
ইসলাম গ্রহণের আগে উমর (রাঃ) ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম শক্তি। কিন্তু তাঁর ইসলাম গ্রহণ ছিল মক্কার মুসলিমদের জন্য এক বিশাল বিজয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে 'ফারুক' বা 'সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী' উপাধি দিয়েছিলেন। তাঁর আগমনে মুসলিমরা প্রথম প্রকাশ্যে কাবার সামনে নামাজ পড়ার সাহস পায়।
২. অর্ধ-পৃথিবীর শাসক কিন্তু জীবন ছিল সাধারণ
হযরত উমর (রাঃ) যখন অর্ধ-পৃথিবী শাসন করছেন, তখন তাঁর নিজের কোনো সুরম্য প্রাসাদ ছিল না। তিনি ছেঁড়া জামা পরে মদিনার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। রোমান সম্রাটদের দূত যখন মদিনায় আসত, তারা অবাক হয়ে দেখত—সমগ্র বিশ্বের পরাক্রমশালী সম্রাট খেজুর গাছের নিচে মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর এই সাধারণ জীবনযাপনই ছিল তাঁর শাসনের মূল শক্তি।
৩. কালজয়ী প্রশাসনিক সংস্কার
বর্তমান বিশ্বের অনেক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হযরত উমর (রাঃ)-এর প্রবর্তিত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি যে সব সংস্কার করেছিলেন:
হিজরি সন: তিনি হিজরতকে কেন্দ্র করে ইসলামি ক্যালেন্ডার বা হিজরি সনের প্রবর্তন করেন।
মজলিসে শূরা: খলিফা হয়েও তিনি জনগণের পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না।
পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ: নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সর্বপ্রথম নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠন করেন।
বায়তুল মাল: রাষ্ট্রের কোষাগার বা বায়তুল মালকে তিনি একটি সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানের রূপ দেন।
৪. জেরুজালেম বিজয় ও অনন্য মানবিকতা
হযরত উমর (রাঃ)-এর আমলেই পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেম মুসলিমদের অধিকারে আসে। জেরুজালেম বিজয়ের সময় তিনি দয়া ও উদারতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। তিনি বিজিত অঞ্চলের অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার পূর্ণ গ্যারান্টি দিয়েছিলেন।
৫. রাতের আঁধারে প্রজাদের সেবা
হযরত উমর (রাঃ) রাতে ছদ্মবেশে মদিনার অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। এক রাতে তিনি দেখতে পেলেন এক মা তাঁর সন্তানদের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে হাঁড়িতে পাথর জ্বাল দিচ্ছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের কাঁধে আটার বস্তা বহন করে সেই মহিলার ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মরে, তবে তার জন্য খলিফা উমরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।"
৬. পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের পতন
তাঁর দক্ষ সেনাপতিত্বে ইসলামের ঝাণ্ডা পারস্যের কিসরা ও রোমের কাইসারের দম্ভ চূর্ণ করে দিয়েছিল। তৎকালীন দুই সুপার পাওয়ারকে পরাজিত করে তিনি ন্যায় ও সাম্যের শাসন কায়েম করেছিলেন। তাঁর সাহসিকতা আর কৌশলের কাছে তৎকালীন বিশ্ব ছিল স্তম্ভিত।
উপসংহার
হযরত উমর (রাঃ) ছিলেন এমন এক শাসক, যাঁর শাসনব্যবস্থায় কোনো স্বজনপ্রীতি বা জুলুম ছিল না। তাঁর জীবনী আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতা মানে বিলাসিতা নয়, ক্ষমতা মানে জনগণের সেবার আমানত। বর্তমান বিশ্বের শাসকদের জন্য তাঁর জীবন এক অনিবার্য পাঠ্যবই।
👉 নবী-রাসূলদের এমন আরও বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD

Comments
Post a Comment