বাল দেবতার পূজা, বনী ইসরাইলের ইতিহাস, হযরত ইলিয়াস আঃ এর মুজিজা, ইসলামের ইতিহাস।
অবিচল সত্যের সেনানী হযরত ইলিয়াস (আঃ): বাল মূর্তিপূজার পতন ও অলৌকিক ইতিহাস
বনী ইসরাইল জাতির ইতিহাসে হযরত সুলাইমান (আঃ)-এর ইন্তেকালের পর যখন এই জাতিটি আবার মূর্তিপূজা এবং চরম পাপাচারের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাদের সতর্ক করতে আল্লাহ তাআলা হযরত ইলিয়াস (আঃ)-কে প্রেরণ করেন। তাঁর জীবন ছিল তাওহীদের ঝাণ্ডা উড্ডীন করার এক অবিস্মরণীয় সংগ্রাম।
১. সিরিয়া ও বালবাক অঞ্চলের পটভূমি
হযরত ইলিয়াস (আঃ) বর্তমান সিরিয়ার বিখ্যাত 'বালবাক' (Baalbek) জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন। এই অঞ্চলের মানুষ আল্লাহর একত্ববাদ ভুলে গিয়ে 'বাল' (Baal) নামক একটি বিশাল স্বর্ণমূর্তির পূজা করত। এই মূর্তির উচ্চতা ছিল প্রায় আশি হাত এবং এর পূজার জন্য তারা বিশাল রাজকীয় উপাসনালয় তৈরি করেছিল।
২. আপসহীন দাওয়াত ও রাজা-রানির বিরোধিতা
হযরত ইলিয়াস (আঃ) অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। তিনি রাজ দরবারে গিয়ে সরাসরি রাজাকে বললেন, "তোমরা কি 'বাল' মূর্তির পূজা করবে এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে ত্যাগ করবে?" কিন্তু তৎকালীন জালিম রাজা এবং তার দুশ্চরিত্রা রানি 'ইযাবিল' নবী ইলিয়াস (আঃ)-এর ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তারা তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং দেশ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
৩. অলৌকিক পরীক্ষা ও চরম দুর্ভিক্ষ
রাজা এবং তার প্রজারা যখন নবীর কথা অমান্য করে মূর্তিপূজায় অনড় রইল, তখন হযরত ইলিয়াস (আঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তাঁর দোয়ার ফলে সেই অঞ্চলে টানা তিন বছর কোনো বৃষ্টি হলো না। চারদিকে শুরু হলো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। মানুষ ও পশুপাখি অনাহারে মারা যেতে লাগল। বনী ইসরাইলরা তখন বুঝতে পারল যে, তাদের সোনার 'বাল' মূর্তি তাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারছে না।
৪. অলৌকিক মুজিজা ও তাওহীদের বিজয়
দুর্ভিক্ষের এক পর্যায়ে বনী ইসরাইলের লোকেরা নবীর কাছে এসে ক্ষমা চাইল এবং বৃষ্টি প্রার্থনা করতে বলল। ইলিয়াস (আঃ) তাদের এক বিশাল পরীক্ষার সম্মুখীন করলেন। তিনি বললেন, "তোমাদের মূর্তিপূজারি পুরোহিতদের ডাকো, আর আমিও আসি। আমরা উভয়েই আল্লাহর দরবারে কুরবানি পেশ করব। যাঁর কুরবানি আসমানের আগুন এসে পুড়িয়ে দিয়ে কবুল করবে, তিনিই সত্য।"
মূর্তিপূজারীদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের কুরবানি কবুল হলো না। কিন্তু হযরত ইলিয়াস (আঃ) যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, তখন আকাশ থেকে অলৌকিক আগুন এসে তাঁর কুরবানি জ্বালিয়ে দিল। এই অলৌকিক মুজিজা দেখে বনী ইসরাইলের সাধারণ মানুষ সত্যের পথে ফিরে আসে এবং অনেক মূর্তিপূজারি ধ্বংস হয়।
৫. হযরত আল-ইয়াসা (আঃ) এবং ইলিয়াস (আঃ)-এর বিদায়
জীবনের শেষভাগে হযরত ইলিয়াস (আঃ) তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে হযরত আল-ইয়াসা (আঃ)-কে গড়ে তোলেন এবং তাঁর ওপর বনী ইসরাইলের দায়িত্ব অর্পণ করেন। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাঁর প্রিয় এই নবীকে এক অলৌকিক উপায়ে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়েছিলেন।
উপসংহার
হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর জীবনী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সংখ্যায় কম হলেও সত্যের ওপর টিকে থাকলে আল্লাহর সাহায্য অবশ্যই আসে। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা ভুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাকী দাঁড়িয়ে সত্যের প্রচার করা প্রতিটি মুমিনের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
.png)
Comments
Post a Comment