জুল-কিফল নবীর ইতিহাস, বনী ইসরাইলের ইতিহাস, হযরত আল-ইয়াসা ও জুল-কিফল, ইসলামের ইতিহাস।
ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক হযরত জুল-কিফল (আঃ): আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতার এক অনন্য ইতিহাস
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনবিয়া এবং সূরা সোয়াদ-এ আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত প্রশংসার সাথে যে ক’জন মহান নবীর নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁদের মধ্যে হযরত জুল-কিফল (আঃ) অন্যতম। তিনি ছিলেন এমন একজন নবী যিনি আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি নিজের জাতির বিচার ও শাসনকার্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেছিলেন।
১. 'জুল-কিফল' নামের অর্থ ও পরিচয়
'জুল-কিফল' কোনো একক নাম নয়, এটি একটি সম্মানসূচক উপাধি। আরবি ভাষায় 'জুল' শব্দের অর্থ হলো 'অধিকারী' এবং 'কিফল' শব্দের অর্থ হলো 'অঙ্গীকার' বা 'দ্বিগুণ প্রতিদান'। অর্থাৎ, যিনি তাঁর অঙ্গীকার বা দায়িত্ব পুরোপুরি রক্ষা করেছিলেন, তাঁকে 'জুল-কিফল' বলা হয়। তাঁর আসল নাম নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে তাঁর নাম ছিল 'বিশর'। তিনি ছিলেন হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর পুত্র অথবা নিকটাত্মীয়।
২. আল-ইয়াসা (আঃ)-এর ঘোষণা ও ৩টি কঠিন শর্ত
হযরত আল-ইয়াসা (আঃ) যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং বুঝতে পারলেন যে তাঁর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন তিনি বনী ইসরাইলকে একত্রিত করে একটি ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, "আমি আমার পরে এমন একজনকে দায়িত্ব দিতে চাই, যে আমার ৩টি শর্ত মেনে চলবে: ১. সে প্রতিদিন রোজা রাখবে। ২. সে সারারাত জেগে ইবাদত করবে। ৩. সে বিচার বা শাসনের সময় কখনোই রাগান্বিত হবে না।"
সেই বিশাল মজলিসে কেউই সাহস করে দাঁড়াতে পারল না। কিন্তু একজন যুবক হাত তুলে বললেন, "হে আল্লাহর নবী! আমি এই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।" তিনবার ঘোষণা দেওয়ার পরও কেবল এই যুবকটিই দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন হযরত জুল-কিফল (আঃ)।
৩. শয়তানের প্রলোভন ও অলৌকিক ধৈর্য
ক্ষমতা ও নবুওয়াত লাভের পর হযরত জুল-কিফল (আঃ) শর্তগুলো কঠোরভাবে পালন করতে শুরু করলেন। তিনি দিনে রোজা রাখতেন, রাতে আল্লাহর ইবাদত করতেন এবং দুপুরে সামান্য সময় বিশ্রাম নিতেন। তাঁর এই অসাধারণ ধৈর্য দেখে ইবলিস শয়তান অত্যন্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল। শয়তান তাঁকে রাগান্বিত করে তাঁর ৩ নম্বর শর্তটি ভঙ্গ করার ষড়যন্ত্র করল।
একদিন দুপুরে যখন তিনি সামান্য বিশ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন ইবলিস একজন বৃদ্ধের রূপ ধারণ করে তাঁর দরবারে এসে কান্নাকাটি শুরু করল। সে বলল, "হুজুর! আমার ওপর চরম অন্যায় করা হয়েছে। আমার পাওনাদাররা আমাকে মারধর করছে। আপনি এখনই এর বিচার করুন।"
নবী শান্তভাবে তাকে বললেন, "তুমি বিকেলে এসো, আমি এর ফয়সালা করে দেব।" কিন্তু বিকেলে সে এল না। পরের দিন দুপুরে যখন তিনি আবার বিশ্রামের জন্য গেলেন, শয়তান আবার এসে একই অজুহাতে তাঁকে বিরক্ত করতে লাগল। এভাবে টানা কয়েকদিন বিশ্রামের সময় শয়তান তাঁকে উত্যক্ত করার চেষ্টা করেও তাঁর মুখে সামান্যতম রাগের চিহ্ন ফুটিয়ে তুলতে পারল না। শয়তান তাঁর ধৈর্যের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হলো।
৪. শাসনকার্য ও আমানতদারি
হযরত জুল-কিফল (আঃ) কেবল একজন ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত সফল বিচারক ও শাসক। বনী ইসরাইলের জটিল সামাজিক সমস্যাগুলো তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে সমাধান করতেন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য তাঁর দরবারে সমান বিচার নিশ্চিত ছিল। তাঁর শাসনামলে বনী ইসরাইল জাতি দীর্ঘদিন পর এক সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ জীবন উপভোগ করেছিল।
৫. মৃত্যু ও পবিত্র সমাধি
হযরত জুল-কিফল (আঃ) তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব এবং তাঁর অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। বর্তমান ইরাকের 'আল কিফল' নামক শহরে তাঁর পবিত্র সমাধি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা আজও দর্শনার্থীদের কাছে এক ঐতিহাসিক স্থান।
উপসংহার
হযরত জুল-কিফল (আঃ)-এর জীবনী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করলে তা আমানতদারির সাথে পালন করা কতটা জরুরি। রাগ মানুষের ঈমান ও ধৈর্যকে ধ্বংস করে দেয়। জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা আমরা এই মহান নবীর জীবন থেকে পাই।
👉 নবী-রাসূলদের এমন আরও বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD
.png)
Comments
Post a Comment