বনী ইসরাইলের ইতিহাস, হযরত ইয়াকুব ও ইউসুফ (আঃ), সবরে জামিল বা সুন্দর ধৈর্য, ইসরাইল নামের অর্থ।
বনী ইসরাইলের প্রাণপুরুষ হযরত ইয়াকুব (আঃ): ধৈর্য ও বিশ্বাসের এক অমর ইতিহাস
পবিত্র কুরআনের পাতায় যে ক’জন নবীর ধৈর্য ও ত্যাগের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে হযরত ইয়াকুব (আঃ) অন্যতম। তিনি ছিলেন হযরত ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র এবং হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর পৌত্র। তাঁর জীবন থেকে আমরা পাই 'সবরে জামিল' বা সুন্দর ধৈর্যের এক অনন্য শিক্ষা।
১. জন্ম ও বংশপরিচয়
হযরত ইয়াকুব (আঃ) ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর মনোনীত এক মহান নবী। তাঁর বংশ থেকেই পরবর্তীতে বনী ইসরাইল জাতির উদ্ভব ঘটে। তাঁর বারোজন পুত্রসন্তান ছিল, যাঁদের মধ্য থেকে হযরত ইউসুফ (আঃ) নবুওয়াত লাভ করেছিলেন।
২. 'ইসরাইল' উপাধির রহস্য
পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আঃ)-কে ‘ইসরাইল’ নামে সম্বোধন করা হয়েছে। হিব্রু ভাষায় 'ইসরা' অর্থ বান্দা বা দাস এবং 'ইল' অর্থ আল্লাহ। অর্থাৎ ইসরাইল নামের অর্থ হলো ‘আল্লাহর বান্দা’। তাঁর এই নামের ওপর ভিত্তি করেই তাঁর বংশধরদের 'বনী ইসরাইল' বলা হয়।
৩. প্রিয় পুত্র ইউসুফ (আঃ) ও বিচ্ছেদের বেদনা
হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল তাঁর অতি আদরের পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর বিচ্ছেদ। সৎ ভাইদের ষড়যন্ত্রে ইউসুফ (আঃ) যখন নিখোঁজ হন, তখন ইয়াকুব (আঃ) ভেঙে পড়েননি। তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর প্রিয় পুত্রের অপেক্ষায় অশ্রু বিসর্জন করেছেন, যার ফলে তাঁর দৃষ্টিশক্তি পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনও আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করেননি, বরং বলেছিলেন— "আমি আমার দুঃখ ও অস্থিরতা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।"
৪. সবরে জামিল: ধৈর্যের সর্বোচ্চ শিখর
বিপদের মুখেও অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখাকে বলা হয় 'সবরে জামিল'। ইয়াকুব (আঃ) এই ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক ছিলেন। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর যখন তিনি তাঁর হারানো পুত্র ইউসুফ (আঃ)-কে মিশরের আজিজ বা শাসক হিসেবে ফিরে পান, তখন তাঁর সেই ধৈর্য ও বিশ্বাসের চূড়ান্ত বিজয় হয়। ইউসুফ (আঃ)-এর জামার স্পর্শে তিনি ফিরে পান তাঁর হারানো দৃষ্টিশক্তি।
৫. শেষ জীবন ও অসিয়ত
জীবনের শেষ সময়ে হযরত ইয়াকুব (আঃ) ফিলিস্তিন ছেড়ে মিশরে পুত্র ইউসুফ (আঃ)-এর কাছে চলে যান। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর বারোজন পুত্রকে একত্রিত করে এক গুরুত্বপূর্ণ অসিয়ত করেছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমার মৃত্যুর পর তোমরা কার ইবাদত করবে?" তাঁর সন্তানেরা একবাক্যে উত্তর দিয়েছিল, "আমরা আপনার এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহ—সেই এক আল্লাহর ইবাদত করব।"
উপসংহার
হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর জীবনী আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, আল্লাহর রহমতের আলো ঠিকই ফুটে উঠবে। আমাদের উচিত বিপদে ধৈর্য ধারণ করা এবং সর্বদা আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। বনী ইসরাইল জাতির এই আদি পিতার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আমাদের ঈমানি পথকে আরও মজবুত করতে পারি।

Comments
Post a Comment