মাদইয়ান জাতির ধ্বংসের ইতিহাস, ওজনে কম দেওয়ার পরিণাম, খতিবুল আম্বিয়া, ইসলামের ইতিহাস।
খতিবুল আম্বিয়া হযরত শুয়াইব (আঃ): মাদইয়ান জাতির উত্থান ও পতনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস
ইসলামের ইতিহাসে যে ক’জন নবী তাঁদের চমৎকার বাকপটুতা এবং যুক্তিনির্ভর দাওয়াতের জন্য পরিচিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত শুয়াইব (আঃ) অন্যতম। সুন্দরভাবে কথা বলার দক্ষতার কারণে তাঁকে ‘খতিবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বক্তা বলা হয়।
১. মাদইয়ান জাতি ও তাদের ভৌগোলিক পরিচয়
হযরত শুয়াইব (আঃ) মাদইয়ান নামক জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন। মাদইয়ান ছিল লোহিত সাগরের উপকূলে সিরিয়া এবং হেজাজের মধ্যবর্তী একটি অঞ্চল। এই জাতিটি ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত উন্নত ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে শিরক এবং অনৈতিকতার চরম বাড়াবাড়ি ছিল।
২. মাদইয়ান জাতির প্রধান অপরাধ
এই জাতির প্রধান সমস্যা ছিল দুটি। প্রথমত, তারা আল্লাহর একত্ববাদ ত্যাগ করে 'আইকা' নামক একটি গাছের পূজা করত। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক লেনদেনে তারা ছিল চরম দুর্নীতিবাজ। তারা মাপে এবং ওজনে কম দিত এবং মানুষের সম্পদ কেড়ে নিত। হযরত শুয়াইব (আঃ) তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, "হে আমার জাতি! তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না।"
৩. খতিবুল আম্বিয়ার দাওয়াত
হযরত শুয়াইব (আঃ) অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এবং যুক্তির মাধ্যমে তাদের বোঝাতেন। তিনি বলতেন, "আল্লাহর দেওয়া হালাল উপার্জনই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা মুমিন হও।" তিনি তাদের মনে করিয়ে দিতেন লুত (আঃ) এবং হুদ (আঃ)-এর জাতির পরিণতির কথা। কিন্তু অহংকারী মাদইয়ানবাসীরা তাঁকে উপহাস করত এবং দেশ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিত।
৪. ভয়াবহ ধ্বংস ও আল্লাহর গজব
দীর্ঘদিন দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন মাদইয়ানবাসী তাদের পাপ থেকে ফিরে এল না, তখন আল্লাহর গজব নেমে আসে। প্রথমে তাদের ওপর নেমে আসে প্রচণ্ড দাবদাহ। গরমে টিকতে না পেরে তারা ছায়ার খোঁজে একটি মেঘের নিচে জড়ো হয়। কিন্তু সেই মেঘ থেকে আগুন এবং প্রচণ্ড বজ্রধ্বনি বর্ষিত হতে থাকে। সাথে সাথে শুরু হয় এক ভয়াবহ ভূমিকম্প। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো মাদইয়ান জাতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
৫. হযরত শুয়াইব (আঃ) ও হযরত মুসা (আঃ)
হযরত শুয়াইব (আঃ)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হযরত মুসা (আঃ)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। মুসা (আঃ) যখন মিশর থেকে পালিয়ে মাদইয়ানে আসেন, তখন শুয়াইব (আঃ) তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং নিজের এক কন্যার সাথে তাঁর বিয়ে দিয়েছিলেন। মুসা (আঃ) দীর্ঘ ১০ বছর শুয়াইব (আঃ)-এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
উপসংহার
হযরত শুয়াইব (আঃ)-এর জীবনী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ব্যবসায়িক সততা কেবল নৈতিক গুণ নয়, এটি একটি বড় ইবাদত। ওজনে কম দেওয়া বা মানুষের হক নষ্ট করা আল্লাহর দৃষ্টিতে কত বড় অপরাধ, তা মাদইয়ান জাতির পরিণতি থেকেই স্পষ্ট। আজকের সমাজে আমাদের প্রতিটি লেনদেনে সততা বজায় রাখা জরুরি।
নবী-রাসূলদের এমন আরও বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD

Comments
Post a Comment