মুসা ও ফেরাউন, নীল নদে লোহিত সাগর পাড়ি, কালিমুল্লাহ, বনী ইসরাইলের ইতিহাস।
কালিমুল্লাহ হযরত মুসা (আঃ): ফেরাউনের পতন ও এক মহাকাব্যিক সংগ্রামের ইতিহাস
মানব ইতিহাসের পাতায় যে ক’জন নবী জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত মুসা (আঃ)-এর নাম সবার উপরে। তিনি ছিলেন আল্লাহর এমন এক নবী, যাঁর সাথে আল্লাহ সরাসরি কথা বলতেন, তাই তাঁকে বলা হয় ‘কালিমুল্লাহ’।
১. জন্ম ও সিন্দুকে ভাসিয়ে দেওয়া
মিশরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউন যখন স্বপ্ন দেখল যে বনী ইসরাইল বংশের এক পুত্রসন্তান তার রাজত্ব ধ্বংস করবে, তখন সে নির্দেশ দিল সব নবজাতক পুত্রসন্তানকে হত্যা করতে। সেই ভয়াবহ সময়ে মুসা (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহর নির্দেশে তাঁর মা তাঁকে একটি সিন্দুকে ভরে নীল নদে ভাসিয়ে দেন। ভাগ্যের এক অলৌকিক লিখন অনুসারে সেই সিন্দুক গিয়ে পৌঁছায় খোদ ফেরাউনের ঘাটে। ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া (আঃ) তাঁকে দত্তক নেন এবং শত্রু ফেরাউনের ঘরেই মুসা (আঃ) লালিত-পালিত হন।
২. মাদইয়ান যাত্রা ও নবুওয়াত লাভ
এক অনিচ্ছাকৃত ঘটনায় একজন কিবতীকে আঘাত করার পর মুসা (আঃ) মিশর ত্যাগ করে মাদইয়ানে চলে যান। সেখানে তিনি হযরত শুয়াইব (আঃ)-এর কাছে ১০ বছর অবস্থান করেন। পরবর্তীতে ফেরার পথে ‘তুর’ পাহাড়ে তিনি প্রথম আল্লাহর নূরের দর্শন পান এবং নবুওয়াত লাভ করেন। সেখান থেকেই তাঁকে তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-সহ ফেরাউনের কাছে তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
৩. মুজিজা ও জাদুকরদের হার মানানো
ফেরাউন নিজেকে খোদা দাবি করত। মুসা (আঃ) যখন তাকে আল্লাহর পথে ডাকলেন, তখন ফেরাউন জাদুকরদের মাধ্যমে মুসা (আঃ)-কে পরাজিত করতে চাইল। মুসা (আঃ) তাঁর লাঠি ছুঁড়ে মারলেন, যা একটি বিশাল অজগরে পরিণত হয়ে জাদুকরদের সব ভেল্কিবাজি গিলে ফেলল। সত্য বুঝতে পেরে জাদুকরেরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।
৪. নীল নদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া ও ফেরাউনের সলিল সমাধি
বনী ইসরাইলকে মুক্ত করে নিয়ে যাওয়ার পথে মুসা (আঃ) এবং তাঁর অনুসারীরা লোহিত সাগরের তীরে আটকা পড়েন। সামনে সাগর, পিছনে ফেরাউনের বিশাল বাহিনী। আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, "তোমার লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করো।" আঘাত করার সাথে সাথে সাগর দ্বিখণ্ডিত হয়ে বারোটি শুকনো রাস্তা তৈরি হলো। মুসা (আঃ) পার হয়ে গেলেও ফেরাউন যখন সসৈন্যে সেই রাস্তায় নামল, তখন সমুদ্র আবার মিলিত হয়ে গেল এবং ফেরাউন সলিল সমাধিতে বিলীন হলো।
৫. তূর পাহাড় ও তাওরাত লাভ
মুক্তির পর বনী ইসরাইলকে নিয়ে মুসা (আঃ) সিনাই প্রান্তরে আসেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ৪০ দিন তূর পাহাড়ে অবস্থান করে আল্লাহর সাথে কথা বলেন এবং আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন। বনী ইসরাইল জাতির অবাধ্যতা এবং গোবৎস পূজার মতো কঠিন পরীক্ষাগুলোর মোকাবেলাও তাঁকে করতে হয়েছিল।
উপসংহার
হযরত মুসা (আঃ)-এর জীবনী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্যের জয় অনিবার্য। যত বড় জালিম শাসকই হোক না কেন, আল্লাহর কুদরতের সামনে তাকে মাথা নত করতেই হয়। মুসা (আঃ)-এর জীবন থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা আজও আমাদের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
নবী-রাসূলদের এমন আরও বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD

Comments
Post a Comment