হযরত ইদ্রিস (আঃ): প্রথম কলম ও সেলাই শিল্পের প্রবর্তক | Prophet Idris (AS) History
ভূমিকা: সভ্যতার আদি শিক্ষক
মানব ইতিহাসের সূচনা লগ্নে মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে কেবল ইবাদতের নিয়মই শেখাননি, বরং জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বিজ্ঞানের শিক্ষাও দিয়েছেন। হযরত আদম (আঃ) এবং হযরত শীস (আঃ)-এর পরবর্তী যুগে যখন মানুষ ধীরে ধীরে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে, তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ইদ্রিস (আঃ)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন মহান আল্লাহর বার্তাবাহক এবং মানব সভ্যতার বিজ্ঞানের আদি শিক্ষক।
১. বংশপরিচয় ও 'ইদ্রিস' নামের রহস্য
হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর আসল নাম ছিল 'আখনুখ'। তিনি ছিলেন হযরত আদম (আঃ)-এর ষষ্ঠ পুরুষ। তাঁর বংশলতিকা হলো— আখনুখ বিন ইয়ারদ বিন মাহলাইল বিন কাইনান বিন আনুশ বিন শীস বিন আদম (আঃ)।
তাকে কেন 'ইদ্রিস' বলা হয়? আরবি 'দারস' শব্দ থেকে ইদ্রিস নামের উৎপত্তি, যার অর্থ হলো পাঠ করা বা অধ্যয়ন করা। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত সহীফা বা আসমানি কিতাবসমূহ এত বেশি পাঠ করতেন যে, আল্লাহ তাঁকে 'ইদ্রিস' উপাধিতে ভূষিত করেন।
২. প্রথম উদ্ভাবক হিসেবে হযরত ইদ্রিস (আঃ)
মানব সভ্যতার আজকের যে আধুনিক রূপ, তার অনেকগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই মহান নবী। ইসলামের ইতিহাসে তাঁকে অনেকগুলো বিষয়ের 'প্রথম প্রবর্তক' বলা হয়:
ক) কলম ও লিখন পদ্ধতির সূচনা
ইতিহাসবিদদের মতে, হযরত ইদ্রিস (আঃ) হলেন পৃথিবীর প্রথম মানুষ যিনি কলম তৈরি করেছিলেন এবং তা দিয়ে লিখতে শিখিয়েছিলেন। এর আগে মানুষ স্মৃতির ওপর নির্ভর করত, কিন্তু তাঁর মাধ্যমেই জ্ঞান সংরক্ষণের লিখিত পদ্ধতি শুরু হয়।
খ) সেলাই শিল্প ও পোশাকের আধুনিকায়ন
ইদ্রিস (আঃ)-এর পূর্বে মানুষ পশুর চামড়া ব্যবহার করে লজ্জা নিবারণ করত। আল্লাহ তাঁকে কাপড় সেলাই করার বিশেষ জ্ঞান দান করেন। তিনিই প্রথম সূঁচ তৈরি করেন এবং কাপড় সেলাই করে পরিধান করার প্রথা চালু করেন। বর্ণনা আছে যে, তিনি যখনই সূঁচ চালাতেন, তখনই 'সুবহানাল্লাহ' পাঠ করতেন।
গ) জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত
মহাকাশ গবেষণা বা নক্ষত্র বিজ্ঞানের আদি জনক বলা হয় ইদ্রিস (আঃ)-কে। নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সময় নির্ধারণ এবং বছরের হিসাব রাখার পদ্ধতি তিনি প্রথম উদ্ভাবন করেন। এছাড়া পরিমাপ ও ওজনের পদ্ধতিও তাঁর মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে।
৩. নবুওয়াত ও দাওয়াতি মিশন
হযরত ইদ্রিস (আঃ) যখন নবী হন, তখন কাবিলের বংশধরেরা পৃথিবীতে অবাধ্যতা ও পাপাচার ছড়িয়ে দিয়েছিল। আল্লাহ তাঁর ওপর ৩০টি সহীফা নাজিল করেন। তিনি তাঁর জাতিকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেন এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে সমাজ গঠন করেন। তিনি প্রায় ১০০টি শহর বা জনপদ গড়ে তুলেছিলেন যেখানে শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত ছিল।
৪. ইদ্রিস (আঃ) এর চারিত্রিক গুণাবলী
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসা করে বলেছেন:
"আর এই কিতাবে ইদ্রিসের কথা আলোচনা করুন, তিনি ছিলেন একজন সত্যবাদী নবী। আমি তাকে উচ্চ স্থানে উন্নীত করেছিলাম।" (সূরা মারইয়াম: ৫৬-৫৭)
তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং সাহসী। তিনি পৃথিবীর প্রথম মানুষ যিনি আল্লাহর পথে জিহাদ বা সংগ্রামের জন্য ঘোড়া ব্যবহার করেছিলেন।
৫. আসমানে গমন ও জান্নাত ভ্রমণ
হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনীর সবচেয়ে অলৌকিক অংশ হলো তাঁর সশরীরে আসমানে গমন। তাফসীরে বর্ণিত আছে যে, তিনি মালাকুল মউত বা আজরাইল (আঃ)-এর সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন। তিনি জাহান্নাম দেখে ভীত হন এবং জান্নাতের নেয়ামত দেখে মুগ্ধ হন। এরপর তিনি জান্নাত থেকে আর বের হতে চাননি। আল্লাহর বিশেষ কুদরতে তিনি চতুর্থ আসমানে জান্নাতে অবস্থান করছেন।
৬. মৃত্যু এবং রহস্য
অধিকাংশ আলেমদের মতে, হযরত ইদ্রিস (আঃ) এখনো চতুর্থ আসমানে জীবিত অবস্থায় আছেন। তবে কিছু রেওয়াত অনুযায়ী চতুর্থ আসমানে তাঁর জান কবজ করা হয়েছে। এই বিষয়ে আল্লাহই ভালো জানেন। তবে কুরআন স্পষ্ট করেছে যে, তাঁকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দান করা হয়েছে।
উপসংহার ও শিক্ষা
হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনী আমাদের দুটি প্রধান শিক্ষা দেয়। প্রথমত, আল্লাহর প্রতি অবিচল ঈমান এবং তওবা। দ্বিতীয়ত, জাগতিক জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার গুরুত্ব। ইসলাম কেবল তসবিহ পাঠের ধর্ম নয়, বরং এটি একটি আধুনিক ও উন্নত সভ্যতা গড়ার নাম।
নবী-রাসূলদের এমন আরও বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD

Comments
Post a Comment