হযরত নূহ (আ) এর জীবনী: মহাপ্লাবন ও ইসলামের ইতিহাসের প্রথম রাসূলের কাহিনী

 


হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনী: এক ধৈর্যশীল রাসূলের ইতিহাস

​ইসলামের ইতিহাসে হযরত ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম)-এর তিরোধানের পর পৃথিবী যখন শিরক ও মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত হয়, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখাতে হযরত নূহ (আ)-কে প্রেরণ করেন। তিনি ছিলেন 'উলুল আযম' বা দৃঢ় সংকল্পধারী পাঁচজন প্রধান রাসূলের একজন।

​বংশপরিচয় ও জন্ম

​হযরত নূহ (আ) এর বংশলতিকা হযরত আদম (আ)-এর দশম পুরুষে গিয়ে মিলিত হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল লামাক। ঐতিহাসিকদের মতে, হযরত ইদ্রিস (আ)-এর মৃত্যুর ১২৬ বছর পর নূহ (আ)-এর জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম ছিল 'আবদুল গাফফার', তবে আল্লাহর ভয়ে তিনি অত্যন্ত বেশি কান্নাকাটি করতেন বলে তাঁকে 'নূহ' (যার অর্থ বিলাপকারী) উপাধি দেওয়া হয়।

​সমাজ সংস্কার ও মূর্তিপূজার সূচনা

​হযরত আদম (আ) থেকে ইদ্রিস (আ) পর্যন্ত মানুষ একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু ইদ্রিস (আ)-এর পর শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ তাদের নেককার পূর্বপুরুষদের (ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসর) সম্মান জানাতে গিয়ে তাদের মূর্তি তৈরি করে এবং এক পর্যায়ে পূজা শুরু করে। এটিই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম শিরক।

​আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব পেয়ে নূহ (আ) যখন তাঁর কওমকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানালেন, তখন তারা তাঁকে বিদ্রূপ করতে শুরু করল।

​৯৫০ বছরের দীর্ঘ দাওয়াতি মিশন

​পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আনকাবূতে বর্ণিত হয়েছে যে, নূহ (আ) তাঁর জাতির মধ্যে দীর্ঘ ৯৫০ বছর অতিবাহিত করেছিলেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি অমানুষিক ধৈর্য ধারণ করেন:

  • ​গোপনে ও প্রকাশ্যে দাওয়াত: তিনি দিনে-রাতে, জনসমক্ষে এবং নিভৃতে মানুষকে বুঝিয়েছেন।
  • ​কাফেরদের অত্যাচার: মানুষ তাঁর কথা না শুনে কানে আঙুল দিয়ে রাখত এবং নিজেদের কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিত। ধনী ও প্রভাবশালীরা তাঁকে 'পথভ্রষ্ট' বলে উপহাস করত।

​এত লম্বা সময়ে মাত্র ৮০ জনের মতো (মতান্তরে কম-বেশি) মানুষ তাঁর ওপর ঈমান এনেছিলেন।

​আল্লাহর নির্দেশ ও কিশতি (নৌকা) নির্মাণ

​যখন জাতির অবাধ্যতা সীমালঙ্ঘন করল এবং তারা নূহ (আ)-কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল যে, "তোমার আজাব নিয়ে এসো," তখন তিনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁকে একটি বিশাল নৌকা তৈরির নির্দেশ দিলেন।

​"আপনি আমার তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী একটি নৌকা তৈরি করুন এবং জালিমদের ব্যাপারে আমাকে কিছু বলবেন না; তারা অবশ্যই নিমজ্জিত হবে।" (সূরা হুদ: ৩৭)


​মরুভূমির মধ্যে নৌকা তৈরি করতে দেখে কাফেররা আরও বেশি হাসাহাসি শুরু করল। কিন্তু নূহ (আ) ধৈর্য সহকারে কাজ চালিয়ে গেলেন। নৌকাটি ছিল তিন তলা বিশিষ্ট এবং অত্যন্ত মজবুত।

​মহাপ্লাবন ও ঐতিহাসিক ধ্বংসযজ্ঞ

​আল্লাহর নির্দেশ এল—যখন চুল্লি থেকে পানি উথলে উঠবে, তখন নূহ (আ) যেন ঈমানদারদের এবং প্রত্যেক প্রজাতির জোড়ায় জোড়ায় পশু-পাখি নৌকায় তুলে নেন।

​আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হলো এবং মাটি থেকে প্রস্রবণের মতো পানি বের হতে লাগল। পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহতম মহাপ্লাবন শুরু হলো। নূহ (আ)-এর নিজের এক ছেলে কেনান এবং স্ত্রী (ওয়ায়েলা) ঈমান না আনায় পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিতে চাইল, কিন্তু আল্লাহর আজাব থেকে কেউ বাঁচতে পারল না। তারা চোখের সামনেই ডুবে মরল। এটি পিতৃহৃদয়ের জন্য ছিল চরম কষ্টের পরীক্ষা।

​জুদী পাহাড়ে তরী ও নতুন সভ্যতা

​টানা ৪০ দিন (মতান্তরে ভিন্ন) প্লাবনের পর পানি কমতে শুরু করল। নূহ (আ)-এর তরী ইরাকের 'জুদী' নামক পাহাড়ে গিয়ে থামল। প্লাবন শেষে নূহ (আ) এবং তাঁর সাথে থাকা মুমিনরা পৃথিবীতে আবার নতুন করে বসতি স্থাপন করলেন। এ কারণেই নূহ (আ)-কে 'আদম-ই সানি' বা দ্বিতীয় আদম বলা হয়। বর্তমান বিশ্বের সমস্ত মানুষ নূহ (আ)-এর তিন পুত্র—সাম, হাম ও ইয়াফিসের বংশধর।

​হযরত নূহ (আ) এর জীবন থেকে শিক্ষা

​১. ধৈর্য ও স্থিতিস্থাপকতা: ৯৫০ বছর ব্যর্থতা সত্ত্বেও তিনি দাওয়াত ত্যাগ করেননি।

২. সন্তান ও পরিবারের হেদায়েত: নবি হওয়া সত্ত্বেও নিজের সন্তানকে হেদায়েত দেওয়া তাঁর হাতে ছিল না; হেদায়েত একান্তই আল্লাহর দান।

৩. শিরকের ভয়াবহতা: শিরক এমন এক পাপ যা একটি জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

৪. আল্লাহর ওপর ভরসা: প্রতিকূল পরিবেশে আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমিতে নৌকা তৈরি করা ছিল অগাধ বিশ্বাসের পরিচয়।

​উপসংহার

​হযরত নূহ (আ)-এর জীবনী আমাদের শেখায় যে, সংখ্যায় কম হলেও সত্যের ওপর অটল থাকাটাই আসল সফলতা। তিনি ছিলেন কৃতজ্ঞ বান্দা এবং মানবজাতির সংকটময় মুহূর্তের ত্রাণকর্তা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে আমরা যেন শিরকমুক্ত জীবন যাপন করতে পারি।

নবী-রাসূলদের এমন আরও বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD

Comments

Popular posts from this blog

​দ্বীন ইনফো (Deen Info) ব্লগে আপনাকে স্বাগতম

রোজা ভঙ্গের কারণ, মাকরূহ ও নিষিদ্ধ কাজসমূহের পূর্ণাঙ্গ তালিকা | Ramadan Guide 2026

ব্যবসায় বরকত লাভের ৫টি সুন্নতি উপায় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব