দৈনন্দিন জীবনের সুন্নাহ ও মাসয়ালা: সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ
দৈনন্দিন জীবনের সুন্নাহ ও মাসয়ালা: আপনার প্রতিটি কাজ হোক ইবাদত
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি কেবল মসজিদের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা যখন নবী কারীম (সা.)-এর দেখানো পথে আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলো—যেমন ঘুমানো, খাওয়া বা হাঁটাচলা করি, তখন সেই সাধারণ কাজগুলোও 'ইবাদত' হিসেবে গণ্য হয়। আজকের ব্লগে আমরা দৈনন্দিন জীবনের অতি প্রয়োজনীয় কিছু সুন্নাহ ও মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা করব।
১. ঘুম থেকে ওঠা ও সকালের সুন্নাহ
একজন মুমিনের দিন শুরু হয় আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে।
- ঘুম থেকে উঠে দোয়া: চোখ মেলার সাথে সাথে ঘুমের দোয়া (আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা...) পাঠ করা।
- হাত ধোয়া: ঘুম থেকে ওঠার পর কোনো পাত্রে হাত দেওয়ার আগে তিনবার কবজি পর্যন্ত হাত ধোয়া সুন্নাহ।
- মিসওয়াক করা: ঘুম থেকে ওঠার পর মিসওয়াক করা নবীজির অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল ছিল। এটি কেবল মুখ পরিষ্কার করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ।
- ফজর নামাজ: দিনের শুরুতেই জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা সারা দিনের বরকতের চাবিকাঠি।
২. খাবার ও পানীয় গ্রহণের সুন্নাহ
খাবার গ্রহণ কেবল ক্ষুধা মেটানো নয়, এটি একটি বড় ইবাদত যদি সুন্নাহ মেনে করা হয়:
- বিসমিল্লাহ বলা: খাওয়ার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা। ভুলে গেলে 'বিসমিল্লাহি আউওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু' বলা।
- ডান হাতে খাওয়া: শয়তান বাম হাতে খায়, তাই মুমিন সবসময় ডান হাতে খাবার ও পানি গ্রহণ করবে।
- বসে পান করা: দাঁড়িয়ে পানি পান করা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা সুন্নাহ।
- খাবারের দোষ না ধরা: খাবার পছন্দ না হলে তা ছেড়ে দেওয়া, কিন্তু খাবারের কোনো ত্রুটি বা সমালোচনা করা সুন্নাহ পরিপন্থী।
- শেষে শুকরিয়া: খাওয়ার শেষে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
৩. পোশাক পরিধান ও সাজসজ্জা
পোশাকের ক্ষেত্রেও ইসলামের সুন্দর নির্দেশনা রয়েছে:
- ডান দিক থেকে শুরু: জামা বা জুতা পরার সময় সবসময় ডান দিক থেকে শুরু করা এবং খোলার সময় বাম দিক থেকে শুরু করা।
- পর্দা রক্ষা: পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং মহিলাদের জন্য মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কবজি বাদে পুরো শরীর আবৃত করা ফরজ।
- আয়না দেখার দোয়া: আয়না দেখার সময় নিজের সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং চরিত্রের সৌন্দর্যের জন্য দোয়া করা সুন্নাহ।
৪. ঘর থেকে বের হওয়া ও চলাফেরা
রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় একজন মুসলিমের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
- দোয়া পড়ে বের হওয়া: ঘর থেকে বের হওয়ার সময় 'বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ...' পাঠ করলে আল্লাহ সেই ব্যক্তির নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।
- সালাম দেওয়া: পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সকল মুসলিমকে সালাম দেওয়া সুন্নাহ।
- দৃষ্টি অবনত রাখা: রাস্তা চলার সময় বেগানা নারী বা পুরুষের দিকে কুদৃষ্টি না দেওয়া ইসলামের কঠোর নির্দেশ।
- পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো: রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা বা ময়লা সরিয়ে ফেলা ইমানের একটি শাখা।
৫. টয়লেটে প্রবেশ ও পবিত্রতার মাসয়ালা
পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক। টয়লেটের সুন্নাহগুলো হলো:
- বাম পায়ে প্রবেশ: দোয়া পড়ে বাম পা দিয়ে প্রবেশ করা এবং ডান পা দিয়ে বের হওয়া।
- পানির ব্যবহার: মল-মূত্র ত্যাগের পর পানি দিয়ে ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করা এবং প্রয়োজনে ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার করা।
- কেবলামুখী না হওয়া: টয়লেটে বসার সময় কেবলামুখী হয়ে বা কেবলাকে পিঠ দিয়ে বসা নিষেধ।
৬. রাতে ঘুমানোর সুন্নাহ
দিনের সমাপ্তিও হওয়া উচিত আল্লাহর স্মরণে:
- অজু করে ঘুমানো: পবিত্র অবস্থায় ঘুমানোর বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
- বিছানা ঝাড়া: ঘুমানোর আগে বিছানাটি তিনবার ঝেড়ে নেওয়া সুন্নাহ।
- ডান কাতে শোয়া: ডান দিকে ফিরে গালের নিচে ডান হাত দিয়ে শোয়া নবীজির সুন্নত।
- সূরা ও দোয়া: সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস এবং আয়াতুল কুরসি পাঠ করা শয়তানের হাত থেকে বাঁচার ঢাল।
উপসংহার
সুন্নাহ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করলে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায় এবং প্রতিটি কাজ সওয়াবের আমলনামায় যুক্ত হয়। আমাদের উচিত ছোট ছোট আমলগুলো থেকে শুরু করা। মনে রাখবেন, আল্লাহ তায়ালা সেই আমলকেই বেশি পছন্দ করেন যা নিয়মিত করা হয়, হোক তা পরিমাণে অল্প।
নবী-রাসূলদের বিস্তারিত জীবনী ও অজানা তথ্য পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন: DeenInfoBD

Comments
Post a Comment