পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য: ইসলাম কী বলে? | Rights of Parents in Islam
পৃথিবীতে মানুষের আগমনের মূল মাধ্যম হলেন পিতা-মাতা। সন্তানের জন্য তাদের ত্যাগ ও ভালোবাসা অতুলনীয়। তাই ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজকের ব্লগে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পিতা-মাতার প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলো বিস্তারিত জানবো।
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাঁর ইবাদত করার নির্দেশের সাথে সাথেই পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:
"তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ২৩)।
একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমার কাছে সুন্দর আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?" নবীজি (সা.) তিনবার 'মা'-এর কথা বললেন এবং চতুর্থবার 'বাবা'-এর কথা বললেন। (সহিহ বুখারী)।
পিতা-মাতার প্রতি প্রধান ১০টি দায়িত্ব ও কর্তব্য
১. তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলা
পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তারা কিছুটা খিটখিটে মেজাজের হতে পারেন। কুরআন আমাদের সতর্ক করে বলেছে যে, তাদের সাথে যেন আমরা বিরক্তি প্রকাশ করে 'উফ' শব্দটিও না করি এবং তাদের সাথে ধমক দিয়ে কথা না বলি।
২. তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।" (তিরমিজি)। তাই সবসময় এমন কাজ করা উচিত যাতে তারা খুশি থাকেন।
৩. তাদের আর্থিক ভরণপোষণ নিশ্চিত করা
সন্তানের ওপর ফরয দায়িত্ব হলো বৃদ্ধ বা অভাবী পিতা-মাতার খাওয়া-দাওয়া, পোশাক এবং চিকিৎসার খরচ বহন করা। আপনার সম্পদে আপনার পিতা-মাতার হক সবার আগে।
৪. তাদের জন্য দোয়া করা
পিতা-মাতা বেঁচে থাকুন বা ইন্তেকাল করুন, সবসময় তাদের জন্য দোয়া করা সন্তানের কর্তব্য। কুরআনে শেখানো সেই শ্রেষ্ঠ দোয়াটি হলো:
রব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগীরা
(অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।)
৫. তাদের আত্মীয় ও বন্ধুদের সম্মান করা
পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের প্রতি ভালোবাসার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ হলো তাদের বন্ধুদের সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং তাদের আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।
৬. তাদের অবাধ্য না হওয়া
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া ইসলামের অন্যতম কবীরা গুনাহ। শিরকের পরেই পিতা-মাতার নাফরমানিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। তবে যদি তারা শিরক বা হারামের আদেশ দেন, তবে তা মানা যাবে না, কিন্তু তবুও তাদের সাথে দুনিয়াবি আচরণ যেন খারাপ না হয়।
৭. তাদের সেবা করা
বিশেষ করে অসুস্থতায় বা বার্ধক্যে তারা যখন শিশুর মতো হয়ে যান, তখন তাদের সেবাকে জান্নাতের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। হাদিসে এসেছে, যে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে পেল অথচ জান্নাত অর্জন করতে পারলো না, তার চেয়ে হতভাগা আর কেউ নেই।
৮. তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া
সংসারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পিতা-মাতাকে যুক্ত রাখা এবং তাদের পরামর্শ নেওয়া তাদের প্রতি সম্মানের একটি বড় অংশ। এতে তারা মানসিকভাবে শান্তি অনুভব করেন।
৯. তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা
পিতা-মাতা মারা গেলে তাদের রূহের মাগফিরাতের জন্য গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করা, মসজিদ বা মাদরাসায় দান করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
১০. ঋণ পরিশোধ করা
পিতা-মাতা কোনো ঋণ রেখে মারা গেলে সন্তানদের প্রথম কাজ হলো সেই ঋণ দ্রুত পরিশোধ করা।
উপসংহার
পিতা-মাতা হলো ঘরের বরকত। তাদের চোখের এক ফোঁটা অশ্রু আপনার দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ করে দিতে পারে। অন্যদিকে তাদের দোয়ার বরকতে আপনার জীবন সফলতায় ভরে যেতে পারে। আসুন, আমরা আজ থেকেই আমাদের ব্যবহারের পরিবর্তন করি এবং তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করি।
ইসলামিক আরও জীবনমুখী পোস্ট ও দোয়া জানতে ভিজিট করুন: DeenInfoBD

Comments
Post a Comment